• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩
তার ইচ্ছামতো আজও হতে পারে চক্রান্ত মূলক বদলির আদেশ

সড়ক প্রধান প্রকৌশলীর ইশারাতে চলছে বদলি বাণিজ্য

সড়ক প্রধান প্রকৌশলীর ইশারাতে চলছে বদলি বাণিজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

ছাত্র-জনতার প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর সড়ক ও জনপথের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। এ কারণে সরকারের প্রায় সব দপ্তরে সংস্কার কাজ চললেও সড়কে চলছে লোক দেখানো পদায়ন ও আওয়ামী পুনর্বাসন।

অভিযোগ রয়েছে, সড়ক প্রধান মঈনুল সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগের দোসর দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের পুনর্বাসনে। আওয়ামীপন্থীদের পুরস্কারস্বরূপ গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে নতুন উপদেষ্টা-সচিবের চোখে ধুলো দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছেন সংস্কার বলে। ক্ষমতাকালীন সময়ে এই সৈয়দ মঈনুল হাসান ১৮তম বিসিএসে নিয়োগ পান। পরবর্তীতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২৫ জানুয়ারি ১৯৯৯ সালে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। তিনি কেন্দ্রীয় বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের চলমান সদস্য। আইইবি-২০২২-২৩ এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের (সবুর-মঞ্জুর প্যানেল) শেখ হাসিনার মতোই বিনাভোটে নির্বাচন করে নির্বাচিত হয়েছিলেন কাউন্সিল মেম্বার (আইইবি মেম্বার নং-১৪৫৫০)। শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে গঠিত সড়ক কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। জানা গেছে, তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। মঈনুল হাসানের আপন চাচাতো ভাই শামসুল আলম কচি মল্লিকপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং নড়াইল জেলা পরিষদের আওয়ামী লীগ সদস্য। সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবন শেষ করলেও জেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিটি ভোট দেড় থেকে দুই লাখ টাকায় কিনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেন তিনি।

গত ৫ আগস্টের পর ট্রেনিং ও উচ্চশিক্ষার নামে বিভিন্ন মেয়াদে ৩০ কর্মকর্তার বিদেশ গমনের অনুমোদন দিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছেন। সড়ক সূত্রের তথ্য মতে, মূলত সরাসরি প্রধান প্রকৌশলী মঈনের তত্ত্বাবধানে এই ৩০ জন আওয়ামী সুবিধাভোগী কর্মকর্তার মাধ্যমেই শেখ পরিবার ও ওবায়দুল কাদেরের বিপুল অবৈধ অর্থ ইতোমধ্যেই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অর্থপাচারের সরাসরি যুক্ত ছিলেন মঈনুল হাসান। এজন্য সড়কের একজন নিয়মিত সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পরেও আওয়ামী বিশেষ মহলের সরাসরি হস্তক্ষেপে তাকে চাকরিজীবনের অধিকাংশ সময় ডেপুটেশনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ করা হয়।অভিযোগ আছে আওয়ামী লীগ আমলে বিগত বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে শুদ্ধি অভিযানের নামে কালো তালিকাভুক্তির মাধ্যমে বাগিয়ে নেন ঠিকাদারদের কাছ থেকে শত শত কোটি টাকা। যে-সব ঠিকাদার মঈনুলের চাহিদা মত ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানায়,তাদের উপর নেমে আসে কাল তালিকাভুক্তির খরঘ। ঘুষের অঙ্কের তারতম্যভেদে একেক ঠিকাদারকে করা হয় একেক মেয়াদে কালের তালিকাভুক্তি। বিস্তর অনিয়মের প্রমাণ থাকার পরেও টাকার বিনিময়ে রেহাই পেয়ে যায় রাঘববোয়ালরা । উল্টো তার বলয়ের কিছু সাংবাদিক দিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে যেসব ঠিকাদারকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে তাদের বিভিন্ন মিডিয়ায়র মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা হয় রাঘব বোয়াল হিসেবে।

বিপুল টাকার একটি অংশ তুলে দেয়া হয় ওবায়দুল কাদেরের স্ত্রী ইশরাতুন নেসা কাদেরের হাতে। বাকি টাকা সরাসরি চলে যায় নিজস্ব বলয়ের কিছু অফিসার, সাংবাদিক, ওবায়দুল কাদেরের ব্যক্তিগত সহকারী ও খুনের মামলার আসামি মতিন, তৎকালীন আওয়ামী পন্থী অ্যাটর্নি জেনারেল ও তার নিজ পকেটে।

আর এখন এই মইনুল প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসে করছে আওয়ামী পন্থীদের পুনর্বাসন ও পুরস্কারস্বরূপ পদায়ন । আর যারাই তার এসব কর্মকাণ্ডের বিপক্ষে কথা বলছে তাদের করা হচ্ছে শাস্তি মূলক ওএসডি কিংবা যোগ্যতা থাকার পরেও কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পদায়ন । মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রে জানা যায় মূলত মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের নতুনত্বের সুযোগে তিনি তাদের যা খুশি তাই বুঝিয়ে করিয়ে নিচ্ছেন তার একক ইচ্ছায় আওয়ামীপন্থীদের পুরস্কারস্বরূপ পদায়ন কিংবা পুনর্বাসন ।অন্যদিকে সন্দেহাতীতভাবে যোগ্যতম হওয়ার পরও কিছু কর্মকর্তাদের করছে শাস্তিমূলকভাবে ওএসডি কিংবা কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে পদায়ন। অন্যদিকে এসব পদায়ন নিয়ে সড়ক ভবনে কর্মকর্তাদের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ ও ক্ষোভ জন্ম নিলে পুরো দায় চাপিয়ে দিচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের বড় বড় কর্তা ব্যক্তিদের উপর। প্রধান প্রকৌশলী মঈনুল নিজ চক্রান্ত ঢাকতে মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের নামে এহেন মিথ্যাচারের কারণে পুরো সড়ক জুড়েই মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের উপর এক প্রকার খুব জন্ম নিচ্ছে। সড়কের একাধিক কর্মকর্তা এক একপ্রকার চাপা ক্ষোভ নিয়েই বলেন , সড়কের অবস্থাও হবে একপ্রকার দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মতোই। আর এর জন্য সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবে আওয়ামী প্রেতাত্মা তথাকথিত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসান। এই ব্যর্থতা এবং বিশৃঙ্খলার দায় মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিরাও এড়াতে পারেন না। সংস্কারের এই সময়েও কেন তাদের আওয়ামী প্রেত আত্মার উপর রাখতে হবে ? কারণ সড়কে অন্ততপক্ষে ১৫ জন প্রকৌশলী রয়েছে যারা মইনুলের চেয়ে শতভাগ কার্যকর ও অভিজ্ঞ।

একটি বিশেষ সূত্র মতে নভেম্বর ডিসেম্বরেই মইনুল হাসানের বাধ্যতামূলক অবসর একপ্রকার সরকারের উচ্চ মহলে সিদ্ধান্ত হয়েই গিয়েছিল। তবে কোনো এক সরকারের উপদেষ্টার বাবার বিশেষ তদবিরে তিনি এখনো বহাল তবিয়তেই রয়েছেন। তবে ইতোমধ্যেই সড়ক ভবনে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মাঝে এ নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়।দেশের প্রথম সারির প্রায় পঞ্চাশটির অধিক গণমাধ্যমে এ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও মঈনুল থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের কাছে এই ধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলোকে মইনুল প্রকাশ করছে তার বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারের ষড়যন্ত্র বলে। বাংলা অ্যাফেয়ার্সসহ দেশের প্রথম সারির একাধিক গণমাধ্যম এজন্য ইতোমধ্যেই এ নিয়ে ভিডিও প্রতিবেদনের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগগুলো প্রমাণের জন্য ইতোমধ্যেই মাঠে নেমেছে। যাতে করে তার বিরুদ্ধে আনিত সকল অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের অভিযোগগুলোর অকাট্য দলিলাদিসহ সরকার তথা পাঠকের সামনে তুলে ধরা যায়।

ধারণা করা হচ্ছে আজও সম্পূর্ণ তার ইচ্ছামতো একই ধরনের একটি বড় কর্মকর্তাদের (অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীদের) বদলি অর্ডার হতে পারে।

সূত্র মতে, আওয়ামীপন্থী কর্মকর্তাদের পুরস্কারস্বরূপ পদায়ন-পুনর্বাসন, লোকদেখানো পদায়ন,বদলী বাণিজ্য ও চক্রান্তের অংশ হিসেবে কুমিল্লা সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জিয়াউল হায়দারকে রাঙ্গামাটি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ময়মনসিংহ সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ রাশেদুল আলমকে সড়ক এডমিনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, পটুয়াখালী সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোঃ মাসুদ করিমকে ঢাকা সড়ক সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, ব্যাপক আলোচিত ও বিতর্কিত নোয়াখালী সড়ক সার্কেল এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রানা প্রিয় বড়ুয়াকে পুনর্বাসনমূলক পদায়ন, আওয়ামী আশীর্বাদপুষ্ট রংপুর সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ সুরুজ মিয়াকে পুনর্বাসনমূলক চট্টগ্রাম সড়ক জোনে পদায়ন, কুমিল্লা সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবু হেনা মোঃ তারেক ইকবালকে সড়ক ভবনের ম্যানেজমেন্ট সার্ভিস উইং-এ , কোন কারন ছাড়াই ভবিষ্যতের কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ময়মনসিংহ সড়ক জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ শওকত আলীকে প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর সংলগ্ন ছুটি প্রশিক্ষণ ও প্রেষণজনিত সংরক্ষিত পদে (ওএসডি), অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ সবুজ উদ্দিন খানকে ভুলতা-দেবুগাম ও মোঃ ফজলে রব্বেকে সিলেট করিডোর প্রকল্পে, গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী কে.এম.শরিফুল আলমকে চুয়াডাঙ্গা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, মানিকগঞ্জ সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার আলম কে প্রধান প্রকৌশলীর স্টাফ অফিসার হিসাবে পদায়ন করার সাথে সাথে ঢাকা সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী রিতেশ বড়ুয়াকে ঢাকা সড়ক বিভাগ থেকে সরিয়ে নেয়ার সাথে সাথে নির্বাহী প্রকৌশলী,তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীদের ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাপক রদবদলের আদেশ আজ অথবা আগামী সপ্তাহের মধ্যে আসতে পারে। যার সবই মূলত প্রধান প্রকৌশলীর একক সিদ্ধান্তে সংঘটিত হলেও সড়ক ভবনে এসে কর্মকর্তাদের কাছে দায় চাপিয়ে দেয়া হবে মন্ত্রণালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের নামে।

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০১:২১এএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।