• ঢাকা, বাংলাদেশ
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

তিন জেলার বরাদ্দ থেকে পিডির নিজ জেলায় ২০ কোটি টাকা স্থানান্তর, কেবিএস প্রকল্পের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি

তিন জেলার বরাদ্দ থেকে পিডির নিজ জেলায় ২০ কোটি টাকা স্থানান্তর, কেবিএস প্রকল্পের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি

জেলা প্রতিনিধি

‘কেবিএস’ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৩০ জুন। তবে মেয়াদ শেষের এই চূড়ান্ত মুহূর্তে এসে প্রকল্পটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও চরম অনিশ্চয়তা। অভিযোগ উঠেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য এই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ৫০ কোটি টাকার মধ্যে ২০ কোটি টাকাই প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রভাব খাটিয়ে তার নিজ জেলা কুষ্টিয়ার একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করেছেন। বিপুল অঙ্কের এই অর্থ সরিয়ে নেওয়ায় তিন জেলার চলমান উন্নয়নকাজে মারাত্মক অর্থসংকট তৈরি হয়েছে। একই সাথে বাস্তব তথ্য গোপন করে প্রকল্পটির মেয়াদ আর না বাড়ানোর একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের কারণে ভেস্তে যেতে বসেছে খুলনা বিভাগের তিন উপকূলীয় জেলার শতকোটি টাকার উন্নয়ন উদ্যোগ।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও সামগ্রিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ২০১৬ সালে কেবিএস (খুলনা-বাগেরহাট-সাতক্ষীরা) প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরবর্তীতে এর মেয়াদ এক দফা বৃদ্ধি করা হয়। সেই বর্ধিত মেয়াদও আগামী ৩০ জুন শেষ হতে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশন ও পিএসসি (প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি) সভায় প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামান মাত্র ১৬টি চলমান স্কিমের (কাজের অংশ) তথ্য উপস্থাপন করেছেন। সভায় তিনি জোর দাবি করেন যে, আগামী জুনের মধ্যেই এই ১৬টি স্কিমের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব।

অথচ মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিন জেলার সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীদের পাঠানো দাপ্তরিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাঠপর্যায়ে এখনও প্রায় শতাধিক স্কিমের কাজ অসমাপ্ত ও চলমান অবস্থায় রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের প্রকৃত ও জরাজীর্ণ চিত্র আড়াল করতেই পিডি সুকৌশলে সীমিত তথ্য উপস্থাপন করে নীতিনির্ধারকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।

মাঠপর্যায়ে সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, তিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় এখনও অসংখ্য সড়ক, সেতু ও কালভার্টের কাজ মাঝপথে আটকে আছে। কোথাও সড়ক খুঁড়ে মাসের পর মাস ফেলে রাখা হয়েছে, কোথাও আবার সেতুর স্প্যান বা পিলারের কাজ অর্ধেক করে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। নির্মাণসামগ্রী সড়কের ওপর স্তূপ করে রাখায় স্থানীয়দের যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। সামনে বর্ষা মৌসুম শুরু হতে চলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, এই অসম্পূর্ণ কাজগুলো দ্রুত শেষ না হলে গোটা অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।

এরই মধ্যে কুষ্টিয়ায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীরা বলছেন, এমনিতেই কাজের গতি ধীর, তার ওপর বড় অঙ্কের তহবিল কেটে নেওয়ায় ঠিকাদারদের পাওনা পরিশোধ ও নতুন করে কাজের গতি বাড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

খুলনা জেলা: খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সাফ জানিয়েছেন, তার জেলায় অন্তত ১৩টি বড় স্কিম নির্ধারিত জুনের মধ্যে শেষ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

সাতক্ষীরা জেলা: সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তার জেলায় প্রায় অর্ধশতাধিক স্কিম অসমাপ্ত থাকার কথা উল্লেখ করে বিস্তারিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন।

বাগেরহাট জেলা: বাগেরহাট থেকেও একই ধরনের প্রতিবেদন পাঠিয়ে সময় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা তুলে ধরা হয়েছে।

প্রকল্পের সাথে যুক্ত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, প্রকল্প পরিচালক শুরু থেকেই একচ্ছত্র ও একক সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন। মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা অংশীজনদের কোনো মতামত বা বাস্তবভিত্তিক পরামর্শকে তিনি তোয়াক্কাই করছেন না।

এক কর্মকর্তা বলেন, "মাঠের বাস্তব পরিস্থিতি এবং পিডি অফিসের ফাইলের তথ্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। এই সমন্বয়হীনতার কারণে অনেকগুলো ভালো স্কিমে কাজের গতি কমে গেছে। শুরু থেকেই তিনি মেয়াদ না বাড়ানোর পক্ষে জেদ ধরে আছেন, যার কারণে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারেরা এখন মানসিকভাবে চরম চাপের মধ্যে কাজ করছেন।"

অসম্পূর্ণ কাজ রেখে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প সমাপ্ত করার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্যরা। চলমান কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে শেষ করার লক্ষ্যে প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ইজ্জত উল্ল্যাহ এবং খুলনা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এ বিষয়ে এলজিইডি বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আধা-সরকারি (ডিও) পত্র পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তারা উল্লেখ করেন, কাজ অসম্পূর্ণ রেখে প্রকল্প বন্ধ করে দিলে সরকারের বিপুল বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়বে, জনগণ কাঙ্ক্ষিত সুফল থেকে বঞ্চিত হবে এবং সরকারের উন্নয়ন ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

জানা গেছে, প্রধান প্রকৌশলী এই চিঠিসমূহ আমলে নিয়ে পরিকল্পনা কমিশন ও প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাঠিয়েছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে প্রকল্প পরিচালক এই সুপারিশগুলোকেও আমলে নিচ্ছেন না।

চলমান স্কিমের ঠিকাদারেরা বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা ও বিল না পাওয়ার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার বলেন, "সময়ের তুলনায় মাঠের কাজ অনেক বাকি। এখন কাজ শেষ করতে না পারলে আমাদের কোটি কোটি টাকা আটকে যাবে। প্রশাসনিক জটিলতা ও অনুমোদনের ভয়ে আমরা তটস্থ। পিডি অফিসে গেলে সমাধানের বদলে উল্টো চাপ দেওয়া হয়।" অন্য এক ঠিকাদার জানান, অতিরিক্ত শ্রমিক লাগিয়েও এত কম সময়ে কাজের গুণগত মান বজায় রেখে শেষ করা অসম্ভব।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরার নির্বাহী প্রকৌশলী তারিকুল হাসান এবং খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী উভয়েই গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন যে, বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় মেয়াদ না বাড়ালে সরকারের এই বিশাল উন্নয়ন উদ্যোগ অপূর্ণাঙ্গ থেকে যাবে।

এসব গুরুতর অভিযোগ, তথ্য গোপন এবং কুষ্টিয়ায় অর্থ স্থানান্তরের বিষয়ে জানতে প্রকল্প পরিচালক মো. কামরুজ্জামানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অত্যন্ত দায়সারা ও দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, "আমি এখানে (এই প্রকল্পে) থাকতে চাই না। প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না।" এরপর প্রকল্পে হওয়া আর্থিক অনিয়ম ও স্কিমের বাস্তব সংখ্যা নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করতেই তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে মুঠোফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

ভোক্তা ও স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, তিন জেলার মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা এই প্রকল্প পরিচালকের বিরুদ্ধে অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক এবং জনস্বার্থে কেবিএস প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হোক।

২১ মে ২০২৬, ০৮:৫৬এএম, ঢাকা-বাংলাদেশ।